Donate to Links


Click on Links masthead to clear previous query from search box

GLW Radio on 3CR



Recent comments



Syndicate

Syndicate content

জলবায়ু পরিবর্তন : একটি মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণ

মূল: টেরি টাউনসেন্ড
ভাষান্তর: হাসান মেহেদী

[Original English version (2007) at http://www.dsp.org.au/node/166. The Democratic Socialist Perspective has now merged with the Socialist Alliance of Australia. This translation into Bangla appeared at Bangladesh's monthly progressive online journal, Shojashapta, on April 14, 2011.]

সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর একটি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে “অ্যান ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ” নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে নাটকীয় করে তুলতে সাহায্য করেছে। পুঁজিবাদী পরিবেশ বিপর্যয়ের সর্বশেষ মূর্তরূপ এই জলবায়ু পরিবর্তন। সঙ্কটের গভীরতা এতো বিশাল যে মানব সভ্যতাসহ পুরো গ্রহের প্রাণশৃঙ্খল সত্যিকার অর্থেই বিনাশের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে।

শিল্পায়ন থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হুমকিটি এই মাত্রায় চলে এসেছে। উষ্ণায়নসৃষ্ট সম্ভাব্য ভয়াবহ দুর্যোগ প্রতিরোধে এখন আমরা বাধ্য হচ্ছি। মানবজাতির সামনে এখন সবথেকে জরুরি বিষয় হলো, কী উপায়ে দ্রুত উষ্ণায়ন প্রতিরোধ করা যায়।

সাধারণ জনতা যতো বেশি সমস্যার গভীরে ঢুকছে এবং বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে, ততো বেশি বুঝতে পারছে যে, প্রতিবেশগত টেকসই সমাজ গঠনের লক্ষ্য অর্জন দূরে থাক, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এড়ানোর জন্যই এখন বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে হবে, আর তার জন্য সময় নেই বললেই চলে।

যা করা দরকার তা হলো— সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে শিল্পায়ন, জ্বালানী, পরিবহন খাত ও জনগণের ভোগাভ্যাস ঢেলে সাজানো এবং ব্যাপক মাত্রায় পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি তৃতীয় বিশ্বের কাছে হস্তান্তর করা— এবং তা কোনোমতেই পুঁজিবাদের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

আল গোর তাঁর সিনেমায় ছবির মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে যা যা ঘটতে পারে তা দেখিয়েছেন। আমাদের জানা অনেকগুলো নজির, যেমন দ্রুত হিমবাহ সঙ্কোচন, মেরু অঞ্চলের বিলীন হয়ে যাওয়া ও ক্ষয়িষ্ণু বরফের চাঁই, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার তীব্র ও ধ্বংসকারী ঘটনাবলীর সাথে সাথে প্রতিবেশের ব্যাপকতর ধ্বংসসাধনের মতো কম প্রকাশিত কিছু নজির উপস্থাপন করেছেন। ২০০০ সালে সর্বপ্রথম উত্তর মেরুর গাঙচিলের গায়ে ফুসকুড়ি দেখা যায়, বরফ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে শ্বেতভল্লুক ডুবে মারা যাচ্ছে ইত্যাদি এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে জীবাণুবাহী মশার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে প’ড়ে কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনাও দেখতে পাই তাঁর চলচ্চিত্রে।

উষ্ণতা বাড়ছেই

পৃথিবীর সবথেকে উষ্ণ বছরগুলোর ১০টি বছরই রেকর্ড করা হয় গত ১৪ বছরের মধ্যে, যার ভেতর ২০০৫ সাল ছিলো ১ম এবং ২০০৬ সাল ছিলো ৬ষ্ঠ উষ্ণতম বছর। সর্বসম্মতভাবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, বায়ুমণ্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব দ্রুত বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান গ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে উৎপন্ন কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প। এ গ্যাসগুলোই তাপ ধারণ করার মধ্য দিয়ে উষ্ণায়ন সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ০.৬০ সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কার্বনের পরিমাণ এখনকার মাত্রায় স্থির রাখলেও আগামী ৩০ বছর পর্যন্ত তাপ বাড়তেই থাকবে। বর্তমানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বিগত ৬ লাখ ৫০ হাজার বছরের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) ২০০১ সালে সতর্ক করে যে, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা যদি শিল্পায়নপূর্ব সময়ের দ্বিগুণে স্থির করা না যায়, তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ৫.৮০ সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পেতে হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২০ সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হবে এবং এজন্য মানবসৃষ্ট গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় কমপক্ষে ৬০-৮০ ভাগ কমিয়ে আনতে হবে।

আইপিসিসি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, যদি নির্গমন না কমানো যায় তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে, এবং ক্রমবর্ধমান হারে গলতে থাকা বরফচূড়াগুলোর প্রতিক্রিয়া বাদ দিয়েই এ হিসাব করা হয়েছে। জরুরি পদক্ষেপ না নিলে পৃথিবীর সবথেকে ঘনবসতিপূর্ণ প্রধান শহরগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে প্রচণ্ড ঝড় ও বন্যা, তীব্র খরা ও মরুকরণ বৃদ্ধি, সুপেয় পানির ভীষণ সঙ্কট এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের মহামারী বৃদ্ধির সূত্রপাত হয়েছে। পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্রদের সংখ্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং তারাই সবথেকে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন বিরূপ নজির পাওয়া যাচ্ছে যার মাধ্যমে এইসব আশঙ্কা শুধু নিশ্চিত হচ্ছে না বরং আগের পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয় বলেও প্রমাণ করছে।

সংস্কারপন্থী ব্রিটিশ প্রাবন্ধিক জর্জ মোনবায়োট কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়ে শক্তিশালী অথচ কম প্রচারিত গ্রীনহাউজ গ্যাসগুলোর ঘনত্বের ওপর ভিত্তি ক’রে দাবী করেছেন যে, অগ্রসর শিল্পোন্নত দেশগুলোর নির্গমনের মাত্রা ২০৩০ সাল নাগাদ শতকরা ৯০ ভাগ কমানোর টার্গেট নেওয়া উচিৎ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে এই লক্ষ্যমাত্রা ৯৪ ভাগ হওয়া উচিৎ বলে তিনি দাবী করেছেন। তিনি বলেন, জোরেসোরে প্রচারিত “২০৫০ সালে ৬০ ভাগ কমানো”র মতবাদ দিয়ে এই সঙ্কট এড়ানো যাবে না।

জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এ সম্পর্কিত দীর্ঘ উদ্যোগহীনতার মূল্য দিতে হতে পারে। যদি গ্রীনল্যান্ড ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফ গ’লে যায়, তাহলে কয়েক দশকের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০ মিটারেরও বেশি বেড়ে যেতে পারে। যদি এর থেকে কম বরফ গলে তাহলে ধীর বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে উত্তর অতলান্তিকের সমুদ্রস্রোত। এই সমুদ্রস্রোত উত্তর ইউরোপে অপেক্ষাকৃত মৃদু তাপমাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে থাকে। আরও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, উষ্ণায়নের ফলে তুন্দ্রা অঞ্চলের বিপুল পরিমাণে হিমায়িত মিথেন গলতে শুরু করেছে এবং এগুলো আকস্মিকভাবে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মিথেন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ২১ গুণ বেশি ক্ষতিকর এবং এটা উষ্ণায়ন প্রক্রিয়াকে প্রচণ্ড পরিমাণে বৃদ্ধি করবে। এরকম অনেক ‘প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া’ রয়েছে যা উষ্ণায়নের গতিকে অকল্পনীয় মাত্রায় বাড়িয়ে দেবে।

পুড়ছে রোম, ‘পুঁজিবাদ’ বাজাচ্ছে বাঁশি

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয় বিষয়ে বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীদের গুরুতর সতর্কীকরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দিয়ে শুরু হয় নি।

১৯৯২ সালে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ১৫৭৫ জন বিজ্ঞানী, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত, ‘মানবজাতির প্রতি পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সতর্কীকরণ’ শীর্ষক ঘোষণায় স্বাক্ষর ক’রে সতর্ক করেন যে, “মানবজাতি ও পৃথিবীর প্রকৃতি একটি সংঘাতপূর্ণ গতিপথে রয়েছে। মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশ ও এর স্পর্শকাতর সম্পদের ওপর রূঢ় আঘাত হানছে এবং অপূরণীয় ধ্বংসসাধন করছে। এখনও নিয়ন্ত্রিত না হলে, আমাদের বর্তমান কার্যক্রম মানবজাতি, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যত হুমকির মুখে পড়বে এবং পৃথিবী এমনভাবে পরিবর্তিত হতে পারে যাতে প্রাণের বর্তমান রূপ টিকে থাকতে পারবে না। এই সংঘর্ষ এড়াতে হলে আমাদের বর্তমান গতিপথের মৌলিক পরিবর্তন আবশ্যক।”

বিশ্বের এই বিজ্ঞানীরা আরো বলেন, “বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র, পানিসম্পদ, মাটি, বন এবং জীবিত প্রজাতিসহ পরিবেশের অঙ্গগুলো অসহনীয় পীড়ন ভোগ করছে। বিশেষ গুরুতর বিষয় হলো, ২১০০ সাল নাগাদ বর্তমান বিদ্যমান প্রজাতির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বাদে সবই বিলুপ্ত হবে যা কখনওই পুনর্জীবিত করা যাবে না।” তাঁদের খোলাখুলি সিদ্ধান্ত ছিলো, “মানবজাতির ব্যাপক দুর্গতি এবং বিশ্বের ‘অপূরণযোগ্য অঙ্গহানি’ প্রতিরোধ করতে হলে পৃথিবী ও প্রাণের ওপর আমাদের তত্ত্বাবধায়ন-পদ্ধতিতে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।”

মানবসমাজ, বিশেষ করে সর্বোচ্চ ধনী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক শক্তিগুলো, দ্রুত ও ব্যাপক আকারে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সহ্যক্ষমতার চেয়ে বেশি পীড়ন করার ফলে ধরিত্রীর প্রতিবেশ ‘অপূরণযোগ্য অঙ্গহানি’র হুমকির মুখে পড়েছে। এর কয়েকটি উদাহরণ হলো: ভূপৃষ্ঠের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক ভূমির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে, পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি স্বাদু পানির উৎস ব্যবহার করা হয়ে গেছে, ৬ কোটি ৫০ লক্ষ বছরের মধ্যে সবথেকে বেশি প্রজাতি এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যা স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক মাত্রা থেকে ১ হাজার গুণ বেশি। মার্কিন ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের ২০০২ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ১৯৮০ সালেই পৃথিবীর পুনরুৎপাদন ক্ষমতা অতিক্রম করে গেছে। ১৯৯৯ সালে তা ২০ শতাংশেরও বেশি অতিক্রম করেছে।

সারা বিশ্বে স্বাদু পানি ক্রমবর্ধমান হারে কমে যাচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা পৃথিবীতে ১১০ কোটি মানুষের নিরাপদ পানীয় জলে প্রবেশাধিকার নেই। স্যানিটেশনের বাইরে রয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ, যা সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক। প্রত্যক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ প্রতিবছর রোগে ভুগে মারা যায় যার ৯০ ভাগই পাঁচ বছরের নিচের শিশু এবং এদের অধিকাংশই উন্নয়নশীল বিশ্বে বাস করে।

সমুদ্র পরিস্থিতি আরেকটি গুরুতর পরিবেশগত বিষয় যা দ্রুত মোকাবেলা করা দরকার। সম্প্রতি দ্য সায়েন্স-এর নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি বড়ো ধরনের গবেষণায় বলা হয়েছে, যদি বর্তমানের মতো অদূরদর্শী হারে বাণিজ্যিক মাৎস্যশিকার চলতে থাকে তাহলে ২০৪৮ সালের পর আর কোনো সামুদ্রিক খাদ্য পাওয়া যাবে না।

বাণিজ্যিক মাৎস্য প্রজাতির এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যেই সমুদ্র ও ঊপকূলীয় এলাকা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৯৫০ সালের পর বাণিজ্যিক মাৎস্যশিকার ৯০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে। সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্তির হার ক্রমশই বাড়ছে, শুধু ১৯৮০ সালেই ১৩ শতাংশ মাৎস্য প্রজাতি বিলুপ্তির শিকার হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, পৃথিবীর বাণিজ্যিক মাৎস্য সম্পদের তিন-চতুর্থাংশ প্রজাতিই অতিরিক্ত সংগ্রহের শিকার হচ্ছে।

এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হবার কারণে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানগুলো আন্তঃশৃঙ্খলহীন হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ঝিনুকের মতো সামুদ্রিক প্রাণী পানি পরিশোধন ও বিষমুক্ত করতে না পেরে ‘মৃত্যুবলয়’ তৈরি করছে। ঘোলাটে পানি ব্যাহত করছে সামুদ্রিক ঘাসের বৃদ্ধি যা বহু মাৎস্য প্রজাতির জরুরি নার্সারির ভূমিকা পালন করে। গবেষণা পরিচালক বরিস ওয়র্ম মন্তব্য করেন, “এ গবেষণার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, … আমরা অবশ্যই একটি নীল গ্রহে বাস করার ধারণা সমর্থন করতে পারি না। সমুদ্রগুলো আমাদের গ্রহকে চিনিয়ে দেয়, এবং এই জল-সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই আমাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে।”

পুরো গ্রহব্যাপী প্রচণ্ড হারে সঙ্কট বেড়ে যাচ্ছে, সাথে সাথে গুণিতক হারে বাড়ছে বৈজ্ঞানিক সতর্কীকরণের সংখ্যা ও মাত্রা। কিন্তু পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণী ও তাদের সরকারগুলো প্রথমে দীর্ঘকাল ধরে সঙ্কটের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে গেছে, এরপর বলেছে যে, সঙ্কটের সতর্কীকরণগুলো অতিরঞ্জিত এবং কোনো না কোনোভাবে এর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া যাবে। যখন সত্যিকারে কিছু করার দরকার পড়েছে, তখন তারা ‘বাঁশি বাজাচ্ছে, যখন পুড়ছে রোম’। তারা অপর্যাপ্ত, বাধ্যবাধকতাহীন, খেয়াল-খুশিমতো পদক্ষেপ নেওয়ার মনস্থ করে, যা দানবীয় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ক্ষতির জন্য সর্বনিম্ন ক্ষতিপূরণ দেবার সুযোগ দিয়েছে।

১৯৯৭ সালে জাতিসঙ্ঘ পরিবেশ কর্মসূচির ‘বিশ্ব পরিবেশ পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে হতাশা প্রকাশ করা হয় যে, “বৈশ্বিক টেকসই ভবিষ্যতের দিকে অগ্রগতি এখনও খুব ধীর। সমস্যাটি যে অতি জরুরি, এমন ধারণা এখনও অনুপস্থিত। আরও পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তহবিল এখনও অপর্যাপ্ত… যদিও এর জন্য যথেষ্ট প্রযুক্তি ও জ্ঞান রয়েছে…। ফলে, যা করা হয়েছে তা সুদূর অতীত এবং যা করা দরকার তা দূর ভবিষ্যত হয়ে যাচ্ছে।”


কিয়োটো প্রোটোকল : অতিক্ষুদ্র উদ্যোগ অতিবিলম্বে

আমরা আবারও একই খেলা খেলতে দেখলাম। যেখানে বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সম্পর্কে ৮০’র দশক থেকে একের পর এক সতর্ক করে যাচ্ছেন, সেখানে ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে গৃহীত কিয়োটো প্রোটোকল-এর আগ পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সমঝোতা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হলো না। এটা আবার ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের আগে কার্যকর করাও গেলো না! যে কিনা পৃথিবীর মোট নির্গমনের ২৩ ভাগের জন্য দায়ী ও শিল্পোদ্ভূত গ্রীনহাউজ গ্যাসের সর্বোচ্চ নির্গমনকারী দেশ সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং অস্ট্রেলিয়া এই চুক্তি অনুমোদন করতে অস্বীকার করলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ও অস্ট্রেলিয়ার (জীবাশ্ম জ্বালানী, তেল ও গাড়ির কোম্পানিগুলোর সমর্থনপুষ্ট) প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড শিল্পায়ন-ঘটিত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অস্তিত্ব নিয়ে অবিরত প্রশ্ন উত্থাপন করে যেতে লাগলেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে এটা জানবার কুড়ি বছর পর— এই এখনও কর্পোরেট বাণিজ্যবান্ধব বাজারভিত্তিক কর্তৃপক্ষ বলছে যে, কিয়োটো প্রোটোকল উৎপাদন-বিরোধী। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় প্রোটোকলের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্ষুদ্র, সেটি ইতোমধ্যেই প্রমাণিত।

ঐতিহাসিকভাবে এবং এখনও প্রধান নির্গমনকারী শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোর কাছে এ চুক্তিতে দাবী করা হয়েছে যে, তারা যেন ১৯৯০ সালের তুলনায় গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন গড়ে মাত্র ৫.২ শতাংশ কমায়। এটুকু করার জন্য তাদের হাতে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময় আছে। এছাড়া, ২০৫০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৬০-৮০ শতাংশ হারে নির্গমন কমানোর প্রয়োজন হলেও (মোনবায়োটের অধিকতর সঠিক হিসাব না হয় ছেড়েই দেওয়া হলো), ২০১২ সালের পর নির্গমন কমানোর কোনো লক্ষ্যমাত্রা বা সময়সীমা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় নি। এই চুক্তি অনুসারে, যেসব উন্নত দেশ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না বা চাইবে না, তারা ‘কিয়োটো প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ‘দূষণের অধিকার’-এর ‘স্বত্ব’ কিনে নিতে পারবে। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৯০-৯১ সালের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের (পূর্ব জার্মানিসহ) অর্থনৈতিক ধ্বসের পর ঐসব দেশের নির্গমনের মাত্রা যে ৪০ শতাংশেরও বেশি কমে গিয়েছিলো সেটি কিয়োটো প্রোটোকলে উল্লেখিত ‘১৯৯০ সালের ভিত্তি’তে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে, রাশিয়া ও ইউক্রেন ঐ মাত্রায় তাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস ‘নির্গমনের অধিকার’ শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে বেচে দেবে এবং পুনরেকত্রিত জার্মানির নির্গমনের মাত্রা কাগজে-কলমে নামিয়ে আনতে পেরেছে।

এই চুক্তিতে প্রত্যেক কর্পোরেট কোম্পানিকেও ‘নির্গমনের অধিকার’ কেনাবেচার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিয়োটো প্রোটোকলের পরিচ্ছন্ন উন্নয়ন পদ্ধতি (সিডিএম)-এর আওতায় অনুন্নত দেশগুলোয় ধনী দেশের কর্পোরেট কোম্পানিগুলো গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে ‘ক্রেডিট’ জমাতে পারবে। যতোদূর জানা যায়, এ ধরনের প্রকল্পগুলো যে কৌশলেই হোক অনুন্নত দেশগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে, এগুলোর সুফল খুবই প্রশ্নবিদ্ধ এবং পরিবেশের অন্যান্য ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানী-সাশ্রয়ী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার জন্য সিডিএম প্রকল্পের আওতায় অস্ট্রেলিয়া সরকার অর্থ-সহায়তা করতে পারবে যদি সেটা অস্ট্রেলিয়ায় না হয়ে ভারতে হয়; অথবা বিএইচপি বিলিটন কোম্পানি অর্থ সহায়তা পাবার জন্য মোজাম্বিকে বায়ুচালিত জেনারেটর স্থাপন করবে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পে যথারীতি কার্বন-ডাই-অক্সাইড উদগীরণ করে যাবে।

প্রায় একই উপায়ে সিডিএম-এর ফলাফল হবে, ধনী দেশগুলোর সরকার ও কর্পোরেট কোম্পানিগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে বাতিল প্রযুক্তির আস্তাকুড়ে পরিণত করবে, কেননা প্রথম বিশ্বে ইতোমধ্যেই জ্বালানী সংক্রান্ত নতুন শিল্প ও যন্ত্রাংশ এসে গেছে। কারণ প্রথম বিশ্বের বাতিল প্রযুক্তি তৃতীয় বিশ্বের বিদ্যমান প্রযুক্তির চেয়ে বেশি ‘পরিচ্ছন্ন’ হতে পারে। এভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পুরনো (ও প্রতিযোগিতায় অক্ষম) অবকাঠামোয় জর্জরিত হয়ে পড়বে যা অত্যন্ত ‘নোংরা’ বিধায় প্রথম বিশ্বে ব্যবহারের অযোগ্য। ওদিকে তৃতীয় বিশ্বে পরিচ্ছন্ন উন্নয়নের জন্য প্রথম বিশ্ব গ্রীনহাউজ ‘ক্রেডিট’ অর্জন করবে।

নিউ সায়েন্টিস্ট-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “কিয়োটো চুক্তির প্রাথমিক ফাঁক-ফোকরগুলো থেকে বোঝা যায়, যদি শিল্পোন্নত দেশগুলো কাগজে কলমে কিয়োটোতে প্রতিশ্রুত ৫.২ শতাংশ নির্গমন কমানোর লক্ষ্য অর্জন করতে পারে তাহলে প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর নির্গমন হ্রাস পাবে মাত্র ১.৫ শতাংশ।”

এছাড়াও, গত ২০০৯-এর অক্টোবরে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পূর্ব ইউরোপের অর্থনৈতিক ধ্বসের পর গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কাগজে কলমে সমন্বয় করা হলেও ১৯৯০ সাল থেকে উন্নত দেশগুলোর বার্ষিক নির্গমনের হার ক্রমেই বেড়েছে এবং শুধুমাত্র ২০০৪ সালে এ হার ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্গমন বেড়েছে ২১.১ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ২৫.১ শতাংশ হারে। পরিবহন খাতে নির্গমন লাফিয়ে লাফিয়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং সুপরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি ও উড়োজাহাজের নির্গমন কিয়োটো প্রোটোকলের আওতাভূক্ত করা হয় নি।

এদিকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ক্রমশই বেড়ে চলেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও) গত নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুসারে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বেড়ে ২০০৫ সালে ৩৭৯.১ পিপিএম (পার্টস্‌ পার মিলিয়ন) দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২০ সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ৪৫০ পিপিএম-এর মধ্যে রাখতে হবে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ জলবায়ু-বিজ্ঞানী, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইলস্‌ অ্যালেন-এর মতে, “এই হারে বাড়তে থাকলে, এটা নিশ্চিত যে আমরা আশঙ্কার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যাবো” যা ২১০০ সাল নাগাদ তাপমাত্রা ৫০ সেলসিয়াস বাড়িয়ে দেবে। মানব সভ্যতা যখন সর্বোচ্চ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তখন পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত পুঁজিবাদী সরকার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলো যা সমর্থন করছে তা মানবজাতি বা এই গ্রহের সামনে কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা কোনো সমাধান নয়

কিছু বিষয় আমাদেরকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় এই ‘সাবেক হবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট’-এর দিকে। আমরা যে হুমকির মুখোমুখি তা বুঝতে এবং জরুরি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নাটকীয় করে তুলতে আল গোরের ‘অ্যান ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ’ সত্যিই একটি চমৎকার কাজ। তবে, সত্যিকার অর্থে কী করা দরকার এবং কী উপায়ে, তা চিহ্নিত করায় তার বক্তব্য একেবারেই ভুল।

গোরের প্রস্তাবিত প্রধান সমাধানগুলো নিতান্ত ব্যক্তিগত: দীর্ঘস্থায়ী বাল্ব লাগানো, বাড়িতে বিদ্যুতের অপচয় কমানো, হাইব্রিড গাড়ি (যে গাড়ি উৎপন্ন তাপ ও ঘূর্ণন দিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপন্ন করে) চালানো ও যোগ্য ও দায়িত্বশীল প্রার্থীকে ভোট দেওয়া। এর বাইরে গোর বড়ো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কয়েকটি দাবী করেছেন এবং স্বেচ্ছায় ব্যাপক আকারে কিয়োটো প্রোটোকলের ‘নির্গমন বাণিজ্য’-এর মতো বাজারভিত্তিক পদক্ষেপ নেবার আহ্বান জানিয়েছেন। আল গোর অবশ্য তথাকথিত ‘পরিচ্ছন্ন কয়লা’ ও পরমাণু বিদ্যুতের উদ্যোগগুলোর অনুমোদন ‘বাজেয়াপ্ত’ করার কথাও উল্লেখ করেছেন।

বৈশ্বিক পরিবেশ সঙ্কটের বিশালত্ব ও উৎস বিবেচনায় এ ধরনের প্রস্তাব দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপর্যাপ্ত ও রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর। গোর ও অন্যান্যরা আমাদের প্রতি কার্বন-নিরপেক্ষ জীবনযাপনের আহ্বান জানান। সেটা কীভাবে সম্ভব যদি পৃথিবীর বড়ো বড়ো অর্থনৈতিক শক্তি কার্বন-নিরপেক্ষ না হয়? যদি গাড়ি কোম্পানি, জীবাশ্ম জ্বালানীভিত্তিক শিল্প-কারখানা, খনি কোম্পানি, বড়ো বড়ো বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি এবং বেসরকারিকৃত গণ-পরিষেবা খাতগুলোর মতো জবাবদিহিতাহীন অনির্বাচিত দানবীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান হারে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন চালাতে থাকে?

তদুপরি, জনগণের প্রতি ‘ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার বন্ধ করুন’, ‘আপনার যন্ত্রাংশ স্ট্যান্ডবাই রাখবেন না’, ‘অতিরিক্ত ভোগ পরিহার করুন’ ইত্যাদি ব্যক্তিগত অভ্যাস পরিবর্তনের আহ্বান বাস্তবায়িত হলেও সমস্যার তুলনায় খুবই তুচ্ছ ভুমিকা পালন করে। যদি পর্যাপ্ত গণ-পরিবহন ব্যবস্থা না থাকে, যদি শ্রমজীবীদের কর্মস্থল, স্কুল, হাসপাতাল ও বিনোদন-কেন্দ্রের কাছাকাছি বসবাসের সুযোগ রেখে নগর পরিকল্পনা না করা হয় তাহলে তারা কীভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে? যদি কর্পোরেট কোম্পানিগুলো গাদা গাদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ট্যান্ডবাই থাকে এমন যন্ত্রাংশ তৈরি করে, তাহলে গোরের আহ্বান শুনতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব!

একজন নেতৃস্থানীয় পুঁজিপতি ও সম্পদশালী উদারনৈতিক রাজনীতিক, যিনি সম্প্রতি পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী পুঁজিবাদী সরকারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের চেষ্টা করছিলেন, যিনি বিশ্বাস করেন যে, পুঁজিবাদ ও বাজার অর্থনীতি পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান করতে পারে; সেই আল গোর পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী কর্পোরেট কোম্পানি ও পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে যাবার কোনো কারণ দেখতে চান না এবং পারেনও না। তিনি সামান্য কয়েকজন সংখ্যালঘু পুঁজিপতি, যারা নিজেদের সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য ধরিত্রীর ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলার জন্য প্রস্তুত, তাদের দ্বারা ও তাদের জন্য পরিচালিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোনো দোষ দেন না।

অবশ্যই একা আল গোর নন, আরও অনেকেই পুঁজিবাদী বাজার-ব্যবস্থার ওপর ভরসা রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সঙ্কটের সমাধান ও অন্যান্য প্রকাশিত ব্যাপকতর পরিবেশগত বিপর্যয়ের দায়ভার ব্যক্তির ওপর চাপান, যদিও তাঁরা ‘গ্রীন ট্যাক্স’ ও আইনগত বিধির প্রয়োজনীয়তা মৃদু সমর্থন করেন। অধিকাংশ মূলধারার পরিবেশবাদী গ্রুপ ও প্রধান গ্রীনপার্টিগুলোও এই একই মতে বিশ্বাস করে। এমনকী মোনবায়োট তার পরিবর্তনবাদী প্রস্তাবের মধ্যেও এক ধরনের ‘কার্বন ট্রেডিং’ অন্তর্ভূক্ত করেছেন, যদিও তার প্রস্তাবিত পদ্ধতি অনেকটা সমতাবাদী। ফলে অধিকাংশ পরিবেশকর্মী এ বিষয়টি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছেন।

প্রকৃত পরিবেশকর্মীর কাছে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট বোধগম্য হলেও কল্পরাজ্য বলে মনে হয় কেননা এটি তখনই সম্ভব হবে যখন পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ ব্যক্তিগত ভোগ প্রচণ্ড মাত্রায় কমিয়ে এনে, টেকসই উৎপাদন কৌশল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে পণ্য কিনে এবং দূষণরোধী প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধরিত্রীর সম্পদের ওপর চাহিদা চরমভাবে কমিয়ে নিয়ে আসে কেবলমাত্র তখনই বড় ব্যবসায়ী ও সরকার ‘বাজারের সঙ্কেত’ বুঝতে পারবে এবং ধীর-প্রবৃদ্ধি অথবা প্রবৃদ্ধিহীনতার কৌশল গ্রহণ করবে ও এর সাথে খাপ খাইয়ে নেবে!

স্থায়িত্বশীলতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে এমন পরিবেশ সচেতনতা ও সংস্কারের গুরুত্বকে আমরা অবশ্যই বাতিল করে দিচ্ছি না। এটি অবশ্যই ভালো বিষয় হবে যদি সাধারণ মানুষ আরও প্রতিবেশ-বান্ধব হবার জন্য তাদের জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করে।

কিন্তু আমাদের পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, এককভাবে এ ধরনের ব্যক্তিগত উদ্যোগ জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে না। এটা অবশ্যই পরিবেশবাদী গণ-আন্দোলনের মূল কৌশল হতে পারে না, কেননা তা প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি থেকে রক্ষা করবে এবং মূল্যবান কর্মশক্তির দৃষ্টি পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ী পদ্ধতিগত চালকগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
এ ধরনের ‘প্রতিবেশগত নৈতিকতা’র বিপুল আবেদনের সামনে ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘মান্থলি রিভিউ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক দরকারী ও সহজবোধ্য প্রবন্ধে মার্কসবাদী প্রতিবেশবিদ জন বেলামি ফস্টার বলেছেন, “আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে ব্যক্তির নৈতিকতাই সামাজিক নৈতিকতার চাবিকাঠি বলে অনুমান করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, যদি মানুষ প্রকৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ব্যক্তিগতভাবে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এবং প্রজনন, ভোগ ও ব্যবসার মতো ক্ষেত্রগুলোতে আচরণ পাল্টায় তাহলে সবকিছুই ভালো হয়ে যাবে।” ফস্টার আরও বলেন, “নৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে সব সময়ই যা উপেক্ষা করা হয় তা হলো: আমাদের [পুঁজিবাদী] সমাজের কেন্দ্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র, যাকে বলা যায় ‘বৈশ্বিক উৎপাদনের ঘানি’।”

পুঁজিবাদী উৎপাদনের ‘ঘানি’ ও পুঁজির পুঞ্জীভবন

বছরের পর বছর ধরে বহু পরিবেশবাদী আন্দোলনের তাত্ত্বিকদের দৃঢ় উক্তি সত্ত্বেও পুঁজিবাদীদের স্বার্থোদ্ধারকারী চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফস্টার সরাসরি কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্‌কৃত পুঁজিবাদের বৈজ্ঞানিক ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মার্কসবাদ শুধু পরিবেশ সঙ্কটের মৌলিক কারণগুলো দেখার অপরিহার্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে না, সঙ্কট সমাধানে সেরা রাজনৈতিক দিক নির্দেশনাও দেয়। একমাত্র পরিবেশ-বিরুদ্ধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী সামাজিক বিপ্লবই পারে এই গ্রহকে দুর্যোগের প্রান্তসীমা থেকে টেনে তুলতে।

ফস্টার পুঁজিবাদী ঘানির যুক্তিগুলোকে ছয়টি উপাদানে ভাগ করেছেন। “কেন্দ্রীয় যৌক্তিকতা নির্ধারণকারী প্রথম উপাদানটি হলো…, সামাজিক পিরামিডের চূড়ায় জনসংখ্যার ক্ষুদ্র একটি অংশের কাছে ক্রমবর্ধমান হারে সম্পদের [পুঁজির] পুঞ্জীভবন। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনব্যাপী বিপুল জনবলের স্বাবলম্বন থেকে বেতনভোগী শ্রমিকে রূপান্তর যা ধারাবাহিক উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান সৈন্যদলের ভূমিকা পালন করে। তৃতীয়ত, লুপ্ত হবার যন্ত্রণা নিয়ে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক লড়াই এবং পুঞ্জীভূত সম্পদ উৎপাদন বাড়াতে পারে নতুন ও বৈপ্লবিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। চতুর্থত, আরও তৃপ্তিহীন ক্ষুধা জন্ম দেবে এমন উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন। পঞ্চমত, সরকার কর্তৃক ক্রমবর্ধমান হারে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব গ্রহণ”… এবং “ষষ্ঠত, পুঁজির ঘানি টানা এবং এর অগ্রাধিকার ও মূল্যবোধ জোরদার করার জন্য গণ-যোগাযোগ ও শিক্ষার মূখ্য উদ্দেশ্য প্রণয়ন।”

ফস্টার শুধু এখানে কার্ল মার্কসের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত বিশ্লেষণ ও পুঁজি সৃষ্টি সম্পর্কে মার্কসের সাধারণ সূত্রের সারাংশ অন্য কথায় প্রকাশ করেছেন।

পুঁজিবাদ-পূর্ব দীর্ঘ পণ্য উৎপাদনের যুগে কৃষক ও কারিগররা জরুরি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার জন্য (যেমন: জুতো কেনার জন্য গম বিক্রি করা) তাদের উৎপাদিত পণ্যের উদ্বৃত্ত অংশ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতো।

এই সম্পর্ক পণ্য ও টাকার একটি চক্র তৈরি করে যা পণ্য-টাকা-পণ্য (সি-এম-সি) চক্র বলা যায় এবং সাধারণভাবে পণ্য ভোগের মধ্য দিয়ে চক্রটি শেষ হয়। কিন্তু পুঁজিবাদী উৎপাদন-ব্যবস্থায় পণ্য উৎপাদনকে সাধারণীকরণের মধ্য দিয়ে চক্রটি টাকা দিয়ে শুরু ও টাকা দিয়ে শেষ হয়। একজন পুঁজিবাদী বিক্রি ক’রে লাভ করার জন্যই কোনো পণ্য কেনে বা উৎপাদন করে, এরপর আরও বেশি বেচবার জন্য আরও বেশি কেনে বা উৎপাদন করে। সূত্রটি এখন ‘এম-সি-এম’ হয়ে গেছে যেখানে ‘এম’ হলো পণ্যটি উৎপাদন বা কেনার জন্য প্রকৃত খরচ এবং উৎপাদনের জন্য নিয়োগকৃত জনবলের শ্রম দ্বারা সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্যের যোগফল।

অবস্থা আর সাধারণ পণ্যের উৎপাদনের মতো নয়, কেননা পুঁজিবাদীদের লক্ষ্য হলো পূর্ববর্তী সরল চক্র থেকে উদ্বৃত্ত পুঁজি ছেঁকে নিয়ে পুনর্বিনিয়োগ বা পুঞ্জীভূত করা এবং এ প্রক্রিয়ার কোনো শেষ নেই। পুঁজিবাদীদের মধ্যকার প্রতিযোগিতার ফলে টিকে থাকার জন্য প্রত্যেকের ‘আয়’-এর পুনর্বিনিয়োগ, পণ্য উৎপাদন বাড়ানো ও বাজার বিস্তৃতির প্রচেষ্টা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কোনো সঙ্কট (যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা) দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হবার আগ পর্যন্ত পুঁজির প্রবণতা হলো জ্যামিতিক হারে উৎপাদন বাড়ানো এবং পুঁজিবাদের খুব গভীরে প্রোথিত এই বৈশিষ্ট্যই পরিবেশের ওপর প্রচণ্ড ও বিবেচনাহীন চাপ প্রয়োগ করছে।

পুঁজিবাদ এমন এক ব্যবস্থা যা নিজের জন্যই যে কোনো অবস্থাতেই সম্পদ পুঞ্জীভবন ও প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে যাবে। এটা এমন একচোখা দৈত্য যা ব্যবসায় সব সময় সর্বকালের সর্বোচ্চ পুঁজি পুঞ্জীভূত করতে চায়। “পুঞ্জীভূত করো, পুঞ্জীভূত করো; এটাই মুসা, এটাই নবী-রসুল”, যেমন বলেছেন কার্ল মার্কস তাঁর “ডাস কাপিটাল” গ্রন্থে। পুঁজিবাদ হলো প্রবাদের সেই মাকড়শা যে একটি ব্যাঙ ধরে পিঠের ওপর নিয়ে নদী পার হবার সময় যখন দু’জনেই মারা যাচ্ছে তখন বলে, “আমি এটাই করি, কেননা এটা আমার স্বভাব।”

এ কারণেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রবৃদ্ধিহীনতা, ধীর প্রবৃদ্ধি বা টেকসই প্রবৃদ্ধি গাঁজাখুরি স্বপ্নমাত্র। একইভাবে, ভোক্তা-সাধারণ ব্যক্তিগতভাবে পরিবেশ-বান্ধব হবার সিদ্ধান্ত নেবার মধ্য দিয়ে পদ্ধতিগত পরিবর্তন হবে, এমন কৌশলকেও দিবাস্বপ্নপ্রসূত বলা যায়। ‘নিশ্চল’ বা ‘সুষম-বিন্যস্ত’ পুঁজিবাদ একটি অসম্ভব বিষয়।

ফস্টার বলেন, “প্রত্যেকই… এই ঘানির অংশ এবং এ থেকে বের হওয়া বা তার ইচ্ছে করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারী ও তার ব্যবস্থাপকরা সম্পদ পুঞ্জীভূত করা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাঠে উন্নতি করার জন্য কাজের মাত্রা বাড়ানোর চাহিদা দ্বারা তাড়িত। এই ঘানিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের অঙ্গীকারের ভূমিকা খুবই সীমাবদ্ধ ও পরোক্ষ: তাদের দরকার শুধু বেঁচে থাকার উপযোগী বেতনের একটি চাকরি। কিন্তু সেই চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং আশানুরূপ মানের জীবনযাপনের আশায় [এলিস-এর] লাল রাণীর মতো নিজের জায়গায় স্থির থাকার জন্য আয়নার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত আরো জোরে দৌড়ানো একান্ত দরকারী হয়ে পড়ে।”

ফস্টারের এই মন্তব্য আমাদেরকে এ সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের সাথে ‘কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সুপরামর্শ দেওয়া’র দিবাস্বপ্নও পরিত্যাগ করতে বলে। নোয়াম চমস্কির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়, “বোর্ডের চেয়ারম্যান সবসময় আপনাকে বলবে যে, তারা জাগরণের প্রতিটি মুহূর্ত কাজ করেন যাতে জনগণ সবথেকে ভালো জিনিসটি সবথেকে কম দামে কিনতে পারে এবং সবথেকে ভালো পরিবেশে কাজ করতে পারে। কিন্তু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সত্য কথাটি হলো, তারা বাজারের সর্বোচ্চ অংশ দখল করতে এবং সর্বোচ্চ লাভ করতে চাইবে এবং চেয়ারম্যান যে-ই হোক না কেন, সে যদি এ কাজটি করতে না পারে তাহলে সেই মুহূর্ত থেকে আর চেয়ারে বসতে পারবে না।”

সেই অ্যাডাম স্মিথের আমল থেকে বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন যে, “পুঁজিবাদ এমন এক ব্যবস্থা যা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে নিবেদিত, এবং শুধু পরোক্ষভাবে— কিছু ‘অদৃশ্য হাত’-এর মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর চাহিদা পূরণ করে।” কিন্তু এটা ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে যে, পূর্বের লক্ষ্যই পরবর্তী লক্ষ্যকে অতিক্রম ও কলুষিত করেছে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মুনাফাই শেষ কথা। পণ্যটি খাদ্য, পোশাক বা আশ্রয়ের মতো মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করলো কি করলো না, বা অপ্রয়োজনীয় লোকদেখানো ভোগ হবে কি না, কিংবা মানুষ বা পৃথিবীর জন্য ধ্বংসাত্মক কি না সেটি তাদের কাছে কোনো বিষয়ই নয়। মুগডাল, গাড়ি বা সিগারেট— যা বেচেই আসুক না কেন, টাকা হলো টাকা।

প্রকৃতিগতভাবে মানুষ ‘ভোক্তা’ নয়। মাল্টি-বিলিয়ন-ডলার পুঁজিপতি কোম্পানির বিজ্ঞাপন সারাক্ষণ আমাদের মনের মধ্যে খেয়াল-খুশিমতো চলা, ফ্যাশন, হালনাগাদ হওয়া, নতুন মডেলের লোভ এবং সেকেলে হবার ভয় দেখিয়ে ‘শুধুমাত্র আরও পণ্য কেনার মধ্য দিয়েই সুখ আসবে’ এমন ধারণার পক্ষে নিয়ে আসে। এই উপায়েই অপ্রয়োজনীয় বা ধ্বংসাত্মক পণ্যের চাহিদা তৈরী ও উৎপাদন হয়।

কেবল ২০০৩ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড়ো বড়ো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ হাজার ৪ শ’ ৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে শুধু জনগণকে আরও পণ্য ও সেবা কিনতে উৎসাহিত করার বিজ্ঞাপন বাবদ। এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৩ সালের শিক্ষা খাতের জাতীয় বাজেটের তুলনা করা যায় যা ছিলো বছরে ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্করা টেলিভিশনে ২১ হাজার বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান দেখেছে যার ৭৫ শতাংশ বিজ্ঞাপন ছিলো ১০০টি বড়ো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার বার্ষিক বিজ্ঞাপন ব্যয় ১ হাজার কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সারা পৃথিবীতে ২০০৭ সালে বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় ২৯ হাজার ৮ শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

কিন্তু পুঁজিবাদীরা নিজ স্বার্থেই অধিকতর জ্বালানী-সাশ্রয়ী পণ্য উৎপাদন এবং নোংরা জীবাশ্ম জ্বালানী বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন ও কার্যকরী নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহারের দিকে যেতে পারতো। অনেক পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীরা বলছেন যে, কর, উদ্দীপনা এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সব পক্ষই লাভবান হতে পারে। বড়ো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো কম খরচে আরও দক্ষতার সাথে পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আরও বেশি মুনাফা করতে পারবে, অপরদিকে ভোক্তারাও আরও পরিবেশ-বান্ধব পণ্য ও জ্বালানী-উৎস পেতে পারবে। একটি সুষম সমাজে এ ধরনের নব নব চিন্তার আলোকে অধিকতর ক্ষতিকর প্রযুক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর প্রতি একক উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ বা জ্বালানীর নেতিবাচক প্রভাবের মাত্রা কমাতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা কোনো সুষম সমাজে বাস করি না।

প্রকৃতির যে কোনো ক্ষতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জনের বৈশিষ্ট্যটিও জন বেলামি ফস্টার উল্লেখ করেছেন। এটি উনিশ শতকের ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম স্টেনলি জেভনস্‌-এর নামে ‘জেভনস্‌ প্যারাডক্স’ হিশেবে পরিচিত। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, পুঁজিবাদী শিল্প-কারখানাগুলো যতো প্রাকৃতিক সুবিধা সাশ্রয়ের উপায় বের করতে পারবে, ততো বেশি পরিমাণে ব্যবহার করবে।

১৮৬৫ সালে তাঁর ‘দ্য কোল কোশ্চেন’ বইতে জেভনস্‌ বলেন, “এ হলো সেই অর্থনীতির প্রয়োগ যা এর (কয়লার) ব্যাপকতর ভোগের দিকে চালিত করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি [লোহা তৈরির] আকরিক-চুল্লিতে প্রচুর পরিমাণ কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনের তুলনায় বেশি খরচ করা হয় তাহলে, কয়লা-ব্যবসার মুনাফা বাড়বে, এ খাতে আরও পুঁজি বিনিয়োগ হবে, কাঁচা লোহার দাম পড়ে যাবে কিন্তু এর চাহিদা বাড়বে, এবং ধারাবাহিকভাবে বিপুল আকরিক-চুল্লি স্থাপিত হবে যা কয়লা সরবরাহের আগেই নিঃশেষ করে ফেলবে।”

অবশ্যই অন্য সবকিছুর মতোই উৎপাদন প্রক্রিয়া বা চূড়ান্ত পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ নতুন প্রযুক্তি আনে। কোন বিষয়টি সর্বোচ্চ মুনাফা তৈরি করে? এটি সাশ্রয়ী, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত কিংবা যৌক্তিক কি না তা খুবই সামান্য ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন প্রযুক্তিই দীর্ঘকাল টিকে রয়েছে। এ সংক্রান্ত গবেষণায় অত্যন্ত কম অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও, এটি নিশ্চিত যে কয়লা ও পরমাণু শক্তির তুলনায় (নেতিবাচক সামাজিক ও পরিবেশগত প্রতিক্রিয়ার ব্যয় হিশেব করা হলে) নবায়নযোগ্য জ্বালানীর উৎসসমূহ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। এসব কারণেই, গণ-পরিবহন ব্যবস্থা, বিশেষত ট্রেন ও ট্রাম, ১৮ শতকের শেষভাগ থেকে এখনও পর্যন্ত চলছে (প্রথম ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে, লন্ডনের টিউব-ব্যবস্থা ১৮৬৩ সালে প্রবর্তিত হয়)।

বিপুল পরিমাণ স্বার্থান্বেষী দল এখনও শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে প্রচুর জঞ্জাল সৃষ্টিকারী, খরুচে ও দূষণকারী ব্যক্তিগত গাড়ির আধিপত্য কায়েম রেখেছে। মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বর্ণনা করেন, বড়ো বড়ো গাড়ি প্রস্তুতকারক, তেল কোম্পানি, স্টিল-কাঁচ-রাবার কারখানা ও সড়ক নির্মাতাদের যোগসাজস এবং ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ধন অসভ্যভাবে বিস্তার লাভ করে [তাঁর ভাষায়] ‘শকট-শিল্পায়ন কমপ্লেক্স’ তৈরি করেছে, এবং একটি অক্ষশক্তিতে পরিণত হয়েছে “যার চারপাশে ২০ শতকের সর্বোচ্চ পুঞ্জীভূত [পুঁজি] ঘুরপাক খাচ্ছে”। এই ‘শকট-শিল্পায়ন কমপ্লেক্স’ এখন তেলভিত্তিক বড়ো বড়ো পুঁজির নির্ভরশীলতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। পরিবহন খাত যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য দায়ী।

হেনরি ফোর্ড-৩’র বিখ্যাত প্রবচন “ক্ষুদ্র গাড়ি তৈরি করে ক্ষুদ্র লাভ’ বিবেচনা করে এখন গাড়ি প্রস্তুতকারকেরা বড়ো কার, ৪৪ গাড়ি ও মিনিভ্যান তৈরি ও বিক্রি ক’রে লাভের পাহাড় গড়ে তুলছে।

বিষাক্ত ধ্বংসোন্মাদনা

পুঁজিবাদী উন্নয়নের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটা প্রাণ-জগৎকে বিষাক্ত বর্জ্য নিষ্কাশনের বিশাল মলাধারের মতো ব্যবহার ক‘রে প্রতিবেশগত ও সামাজিক ধ্বংসোন্মাদনার দায়ভার সামগ্রিকভাবে সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়। বড়ো পুঁজিপতিরা অনেক বেশি লাভ করতে পারে যদি শিল্পবর্জ্য দূরীকরণ, পরিশোধন বা পুনর্ব্যবহারের বিষয়টি তাদের গ্রাহ্যে না আনতে হয়। তার থেকে বিষাক্ত বর্জ্যগুলো বাতাসে বা কাছাকাছি নদীতে ঢেলে দেওয়া অনেক সস্তার কাজ। সামগ্রিকভাবে সমাজ পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে নোংরা জঞ্জাল পরিষ্কার করা অথবা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত হয়ে আরও বেশি ভর্তুকি দেয়।

অথবা, কর্পোরেট কোম্পানিগুলো সমস্ত জঞ্জালটাই সহজেই তৃতীয় বিশ্বে রপ্তানী করে দিতে পারে। গত বছর আগস্টে (২০০৮) ২ হাজার ৮ শ’ কোটি মার্কিন ডলার আয়ের একটি ডাচ কোম্পানি নেদারল্যান্ড সরকারকে দেয় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বর্জ্য নিষ্কাশন ফি এড়ানোর জন্য আইভরি কোস্ট ও পশ্চিম আফ্রিকায় ৫০০ টন বিষাক্ত বর্জ্য নিষ্কাশন করে। বিষাক্ত গ্যাসের প্রতিক্রিয়ায় ১০ জন মারা যায়, ৬৯ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ১ লাখেরও বেশি মানুষের চিকিৎসা নিতে হয়।

অপরদিকে, পেট্রোকেমিক্যাল ও কৃষিবাণিজ্য সম্প্রসারণের সাথে সাথে মুনাফাতাড়িত কৃত্রিম রাসায়নিক দ্রব্যের উন্নতির কারণে পদ্ধতিগত দূষণ চরমভাবে বেড়ে গেছে, এবং প্রাকৃতিক পণ্য (যেমন কাঠ, চামড়া ও সাবান)-এর স্থান কৃত্রিম পণ্য (যেমন প্লাস্টিক, কীটনাশক ও ডিটারজেন্ট) দখল করে নিয়েছে। ফলাফলে কোরিনঘটিত (অর্গানোকোরিন) পণ্য উৎসারিত বর্জ্য যেমন ডায়োক্সিন, পিসিবি (পলিকোরিনেটেড বায়েফিনাইল) ও সিএফসি (ক্লোরোফ্লোরো কার্বন)-এর মতো ফ্রাংকেনেস্টেইন পদার্থ দ্বারা আরও অধিক হারে দূষণ। বিগত দশকের মাঝামাঝি থেকে এ ধরনের পণ্যের উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে দূষণের মাত্রাও বাড়ছে ক্রমাগত হারে।

সংস্কারবাদী পরিবেশ আন্দোলনের স্বীকৃত প্রবক্তা ব্যারি কমোনের ১৯৯২ সালে তাঁর প্রকাশিত ‘মেকিং পিস উইথ দ্য প্লানেট’ গ্রন্থে জানান যে, শুধুমাত্র পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প থেকেই কমপক্ষে ৭০ হাজার ধরনের প্রতিবেশ-বিরুদ্ধ কৃত্রিম রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ প্রাণ-জগতে নিষ্কাশন করা হয়। তিনি বলেন, “এই… রাসায়নিক মিশ্রণগুলো… স্বাভাবিক প্রাণ-রসায়ণকে ব্যাহত করে, বিকারগ্রস্ত করে তোলে, ক্যান্সার সৃষ্টি করে, এবং নানাদিক দিয়ে মৃত্যু ঘটায়। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পগুলো যেসব পণ্য উৎপাদন করে তার নানা দ্রব্য… ধূর্ততার সাথে প্রাণ-রসায়ণের মধ্যে ঢুকে যায়, এবং ফলাফলে আক্রান্ত করে।”

সাধারণভাবে পুঁজির ব্যয় বাড়িয়ে দিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করার লাগাম টেনে ধ’রে মহাশক্তিধর ‘বাজার’ ঈশ্বরকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো প্রাকৃতিক প্রত্যাবর্তন-ব্যবস্থা নেই। প্রকৃতি ও সমাজকে তার আচরণের জন্য কী ভয়ঙ্কর মূল্য দিতে হচ্ছে তাতে এই ঈশ্বরের কিছুই আসে যায় না। ‘পরিবেশ কর’ (গ্রীন ট্যাক্স)-এর মাধ্যমে পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রণ ক’রে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার উদ্যোগ খুব কমই সফল হয়েছে, কেননা বিদ্যমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য নিযুক্ত ‘অনুগত আমলা’দের পৌরহিত্যে কর্পোরেট অর্থায়নে পরিচালিত রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকরাই পুঁজি-সহায়ক সরকারগুলো চালায়।

দূষণের জন্য কর, চার্জ বা জরিমানা এতো কম রাখা হয় যাতে তা মুনাফার গুরুতর ক্ষতি না ডেকে আনে। এটা তাৎক্ষণিকভাবে দূষণ বন্ধ করার চেয়ে বড়ো ব্যবসায়ীর কাছে দূষণকে সস্তা করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের করের প্রবণতা হলো, দূষণমুক্ত ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির দিকে বিনিয়োগের গতিমূখ দ্রুত ও মৌলিকভাবে ঘুরিয়ে দেয়া নয় বরং কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের প্রতি চাহিদাকে উস্কে দেবার মধ্য দিয়ে করের অর্থ ভোক্তার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া।

পণ্য উৎপাদনের অশেষ সম্প্রসারণের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম পুঁজিবাদ যা এই ধরিত্রীর প্রতিবেশ-চক্রের সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, পৃথিবী এই ব্যবস্থার মানবতাহীন লুণ্ঠন ও বিষপ্রয়োগের কারণে টিকে থাকতে পারছে না এবং আজ হোক কাল হোক, সমস্ত প্রতিবেশব্যাপী একটা ভয়াবহ দুর্যোগ ভোগ করতে হবে।

এর থেকে বাঁচতে হলে, পৃথিবী ও এর প্রতিবেশের সঙ্গে মানবজাতিকে সচেতন ও যৌক্তিক আচরণ করতে হবে; বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বিবেচনায় আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছর সময় রয়েছে। স্বভাবগত কারণেই পুঁজিবাদ এটা করতে অক্ষম।

প্রতিবেশ বিষয়ে মার্কস্‌ ও এঙ্গেলস্‌

কিছু পরিবেশ আন্দোলনের তাত্ত্বিক মার্কস্‌ ও এঙ্গেলস্‌-এর পরিবেশ সচেতনতার অভাব ছিলো বলে অভিযোগ করে থাকেন। এমন তো নয়ই বরং মার্কস্‌ ও এঙ্গেলস্‌ ব্যক্তিগতভাবে মানুষের সঙ্গে পরিবেশের আন্তঃসম্পর্কের বিষয়ে সশ্রদ্ধ ও সচেতন ছিলেন এবং তাঁরা টেকসই প্রতিবেশকে সমাজতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছেন। জন বেলামি ফস্টার ও মার্কসবাদ গবেষক পল বার্কেট তাঁদের প্রবন্ধ ও গ্রন্থে এ বিষয়ে মার্কস্‌‌ ও এঙ্গেলস্‌-এর উপেক্ষিত লেখাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সংক্ষেপে তাঁদের অনুসন্ধানগুলো দেখা যাক। পুঁজিবাদ কীভাবে মানুষ ও ধরিত্রীর মধ্যে ‘আন্তঃসম্পর্কের ফাটল’ সৃষ্টি করেছে, মার্কস্‌ বহু জায়গায় তা দেখিয়েছেন। পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা ও তা উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো, বিপুল সংখ্যক মানুষের আকস্মিক ভূমিচ্যুতি এবং শহরের কারখানায় বাধ্যতামূলক শ্রম বিক্রির জন্য গমন। দীর্ঘকাল ধরে চাষাবাদের অভাবে আবাদী জমি অনুর্বর থাকছে, আর অন্যদিকে শহরের সড়ক ও নদীগুলোয় মানব-বর্জ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের তীব্র দুর্গন্ধ।

মার্কস্‌ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে “একটি শিল্পকলা যা শুধু মানুষ নয়, মাটিও লুণ্ঠন করে” বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, এ লুণ্ঠনের ফলে মাটি ও শ্রমের মতো পৃথিবীর চিরস্থায়ী সম্পদগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তিনি পুঁজিবাদের আওতায় থেকে পুঁজিবাদ দ্বারা প্রতিবেশ ধ্বংস হবার পরও এই ব্যবস্থার অধীনে থেকে স্থায়িত্বশীল প্রতিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন।

“ডাস কাপিটাল” [“পুঁজি”] -এর তৃতীয় খণ্ডে মার্কস্‌ বলেছেন, “অর্থনৈতিক উপরিকাঠামো বিবেচনায় নিলে ব্যক্তিগত মালিকানায় পৃথিবীর রূপ হবে উদ্ভট, যেমন উদ্ভট হয় কোনো ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা অন্য কারো হাতে পড়লে। একটি সমাজ, জাতি, এমনকি সকল সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলেও এ পৃথিবীর মালিক হতে পারবে না। তারা পৃথিবীর আমানতকারী মাত্র, যাদের দায়িত্ব হলো, আরও ভালো অবস্থায় উত্তরাধিকারী প্রজন্মের নিকট একে হস্তান্তর করা।”

মানুষ ও প্রকৃতির ‘আন্তঃসম্পর্ক’কে ‘ব্যবস্থাগতভাবে পুনরুদ্ধার’ করা উদ্দেশ্যে পরিবেশ ও শ্রমজীবীদের ওপর পুঁজিবাদী লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া শেষ করার জন্য মার্কস্‌ একটি সামাজিক বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছিলেন যা ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্ত করবে। “ডাস কাপিটাল” [“পুঁজি”] গ্রন্থে মার্কস্‌ লিখেছেন যে কেবলমাত্র “কেবলমাত্র মূল উৎপাদকরাই, শক্তির অন্ধ আধিপত্য বাতিল করে যৌথ নিয়ন্ত্রণের আওতায়, প্রকৃতির সাথে মানুষের ‘আন্তসম্পর্ক’ যৌক্তিকভাবে পরিচালনা করতে পারে।” মানবজাতি ও পরিবেশের মধ্যে এই মিথজীবী সম্পর্ক আবারও “সামাজিক উৎপাদনের সঙ্গত আইন”-এর রূপলাভ করবে। তিনি ঘোষণা করেন যে, “মানবজাতির প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকা” যাকে অন্য কথায় টেকসই উন্নয়নও বলা হয়, তার “অবিচ্ছেদ্য শর্ত হলো চিরন্তন যৌথ সম্পত্তি” হিশেবে ভূমির সচেতন ও যৌক্তিক ব্যবহার।

এঙ্গেলস্‌ তাঁর “প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা” গ্রন্থে বলেছেন, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ‘পরিচালনা’র জন্য “নিছক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, আরও কিছু প্রয়োজন”। প্রয়োজন এযাবৎকালের বিদ্যমান উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন, এবং সমান্তরালভাবে আমাদের সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার পুরো পরিবর্তনের জন্য বৈপ্লবিক উদ্যোগ।

পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের ‘ঘানি প্রতিবেশ-বিরোধী এবং পুঁজি পুঞ্জীভূতকরণ কখনওই যে প্রতিবেশগতভাবে টেকসই সমাজের ভিত্তি হতে পারে না। পুঁজিবাদ এমনকি বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সমস্যাও দ্রুত মোকাবেলা করতে সক্ষম নয়। এগুলো বুঝতে মার্কসবাদ আমাদেরকে কীভাবে সহায়তা করেছে, সেটি তুলে ধরাটাই এই প্রবন্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য।


টেকসই প্রতিবেশের পৃথিবী গড়তে, দরকার সমাজতান্ত্রিক সমাজ

প্রতিবেশগতভাবে টেকসই ধরিত্রীর জন্য সারা পৃথিবীব্যাপী প্রচুর পরিবেশবাদী সংগঠন ভুরি ভুরি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সাধারণ পরিবেশগত সঙ্কটের অনেক যৌক্তিক ও সাধারণ সমাধান রয়েছে। তাদের প্রস্তাবগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া এবং উৎপাদন ও ভোগের প্রকৃতি পরিবর্তনের মতো অস্বাভাবিক প্রস্তাব ছিলো বলে তারা ব্যর্থ হয় নি। তারা ব্যর্থ হয়েছে কারণ তারা বুঝতে পারে নি, পুঁজিবাদ এটি করতে পারবে না। যে সমাজব্যবস্থা ‘মূল উৎপাদক’দের কেন্দ্রে ও হৃদয়ে স্থান দিতে পারে, কেবলমাত্র সেই সমাজব্যবস্থাই সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য একটি টেকসই সমাজ নির্মাণের পথ দেখাতে পারে।

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘পরিবেশ, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র’-এ যেমন বলা হয়েছে, “পরিবেশ রক্ষার্থে তৈরি কোনো প্রস্তাবনা যদি এই ধারণা গ্রহণ না করে তাহলে তা…. দ্রুত অপ্রাসঙ্গিকতায় রূপ নেবে ‘একটি কৌতূহলোদ্দীপক সুপারিশমালা’য় পরিণত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, অথবা পরিবেশ-প্রলাপের একটি নতুন ধাপ্পায় পরিণত হবে, অথবা নিষ্ফল সংরক্ষণবাদিতার রূপ নেবে যা লক্ষ্য পূরণের পথে বারংবার পিছিয়ে পড়বে।

সমাজতন্ত্র যা ‘মূল উৎপাদক’দের দ্বারা এবং তাদের জন্য পরিচালিত সমাজব্যবস্থা, সেটাই পারে উৎপাদনের ‘ঘানি’র দণ্ডটি আটকে বা বন্ধ করার জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে, যাতে আমরা রক্ষা পেতে ও চিন্তা করতে পারি। পারি যৌথভাবে আলোচনা ও যৌক্তিক পরিকল্পনা করতে যাতে এই পৃথিবী ও এর ওপর সকল বাসিন্দাকে রক্ষা করা যায়। তাহলেই কী উপায়ে কী উৎপাদিত হচ্ছে, অথবা ধনী দেশের সাথে তৃতীয় বিশ্বের লেনদেন কেমন হবে সেটি আর মুনাফা দ্বারা নির্ধারিত হবে না।

প্রায় একই সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্র দূষিতকরণ এবং ব্যাপক আকারে পরিবেশগত সঙ্কট তৈরির সাথে সাথে তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও রোগব্যাধি দূর করার জন্য প্রচুর উপকরণ ও জনবল অবমুক্ত হয়েছে।

কখন শুরু হয়েছে এটি? পুঁজিবাদী যুদ্ধ সম্প্রসারণ থেকে শুরু। পৃথিবীর প্রত্যক্ষ সামরিক ব্যয় বার্ষিক ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যার ৫০ শতাংশ খরচ করে যুক্তরাষ্ট্র একা। আনুষঙ্গিক ব্যয় হিশেব করলে শুধু ২০০৮ সালেই যুক্তরাষ্ট্র ৯০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। প্রতিরক্ষা খাতে অস্ট্রেলিয়ার বার্ষিক বাজেট ২২ শ’ কোটি ডলার এবং ৯/১১’র ঘটনার পর ভুয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধে খরচ করা হয়েছে অতিরিক্ত আরো ২ হাজার কোটি ডলার। এই টাকার সামান্য একটি অংশ দিয়েই পৃথিবীব্যাপী ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা দূর করা যায়, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের নিশ্চয়তা দেয়া যায় এবং এইডস্‌ ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

_______________

টেরি টাউনসেন্ড, অস্ট্রেলিয়ার বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী। তিনি অস্ট্রেলিয়ার ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট পার্সপেক্টিভ (ডিএসপি)-এর জাতীয় নেতৃত্বে রয়েছেন। ইতোমধ্যে আদিবাসী অধিকার, নারী অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর একাধিক বই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। এই প্রবন্ধটি “Change the System, not the Climate” পুস্তিকার “Climate Change: A Marxist Analysis” প্রবন্ধের বাংলা ভাষান্তর।

হাসান মেহেদী, পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী।

Powered by Drupal - Design by Artinet